সূরা 81
আত তাকভির
التَّكۡوِيرِ
At-Takwir · মাক্কী · 29 আয়াত
بِسْمِ ٱللَّهِ ٱلرَّحْمَٰنِ ٱلرَّحِيمِ
- 1
إِذَا ٱلشَّمْسُ كُوِّرَتْ
Izash shamsu kuwwirat
সূর্যকে যখন নিষ্প্রভ করা হবে [১],
সূরা সম্পর্কিত তথ্য: রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে কেউ কেয়ামতকে প্রত্যক্ষ দেখতে চায় সে যেন সূরা ‘ইযাস সামছু কুওয়িরাত, ইযাস সামায়ুন ফাতারাত ও ইযাস সামায়ূন সাক্কাত’ পড়ে। [তিরমিয়ী ৩৩৩৩, মুসনাদে আহমাদ ২/২৭, ৩৬, ১০০, মুস্তাদরাকে হাকিম ২/৫১৫] এখানে প্রথম ছয়টি আয়াতের ভাষ্য কিয়ামতের প্রথম অংশ অর্থাৎ শিঙ্গায় প্রথমবার যে ফুৎকার দেয়া হবে তার সাথে সংশ্লিষ্ট। উবাই ইবন কাব রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, ‘কেয়ামতের পূর্বে ছয়টি নিদর্শন রয়েছে। মানুষ যখন হাটে-বাজারে থাকবে, তখন হঠাৎ সূর্যের আলো চলে যাবে এবং তারকারাজি দেখা যাবে; ফলে তারা আশ্চর্য হবে। তারা তাকিয়ে দেখার সময়েই হঠাৎ করে তারাগুলো খসে পড়বে। এরপর পাহাড়গুলো মাটির উপর পড়বে, নড়া-চড়া করবে এবং পুড়ে যাবে; ফলে বিক্ষিপ্ত ধুলোর মত হয়ে যাবে। তখন মানুষ জিনের কাছে এবং জিন মানুষের কাছে ছুটে আসবে। জন্তু-জানোয়ার-পাখি সব মিশে যাবে এবং একে অপরের সাথে একত্রিত হবে। আল্লাহ্ তা’আলা বলেন, “আর যখন বন্য পশুগুলোকে একত্র করা হবে।” [সূরা তাকভীর ৫] তারপর জিন মানুষদের বলবে, আমরা তোমাদের নিকট সংবাদ নিয়ে আসছি। তারা যখন সাগরের নিকট যাবে তখন দেখবে তাতে আগুন জ্বলছে। এ সময়ে সপ্ত যমীন পর্যন্ত এবং সপ্ত আসমান পর্যন্ত এক ফাটল ধরবে। এরপর এক বায়ু এসে তাদেরকে মৃত্যু দিবে।’ [তাবারী] ____________________ [১] আরবী ভাষায় তাকভীর মানে হচ্ছে গুটিয়ে নেয়া। মাথায় পাগড়ী বাঁধার জন্য “তাকভীরুল ‘ইমামাহ” বলা হয়ে থাকে। কারণ, ইমামা তথা পাগড়ী লম্বা কাপড়ের হয়ে থাকে এবং মাথার চারদিকে তা জড়িয়ে নিতে হয়। এই সাদৃশ্য ও সম্পর্কের কারণে সূর্য থেকে যে আলোক রশ্মি বিচ্ছুরিত হয়ে সমগ্র সৌরজগতে ছড়িয়ে পড়ে তাকে পাগড়ীর সাথে তুলনা করা হয়েছে। বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন এই সূর্যকে গুটিয়ে নেয়া হবে। অর্থাৎ তার আলোক বিচ্ছুরণ বন্ধ হয়ে যাবে। তাছাড়া كُوِّرَتْ এর অপর অর্থ নিক্ষেপ করাও হয়ে থাকে। হাদীসে এসেছে, “চাঁদ ও সূর্যকে কিয়ামতের দিন পেঁচিয়ে রাখা হবে।” [বুখারী ৩২০০] [ইবন কাসীর]
- 2
وَإِذَا ٱلنُّجُومُ ٱنكَدَرَتْ
Wa izan nujoomun kadarat
আর যখন নক্ষত্ররাজি খসে পড়বে [১],
[১] অর্থাৎ যে বাঁধনের কারণে তারা নিজেদের কক্ষপথে ও নিজেদের জায়গায় বাঁধা আছে তা খুলে যাবে এবং সমস্ত গ্ৰহ-তারকা বিশ্ব-জাহানের চারদিকে ছড়িয়ে পড়বে। এ ছাড়াও তারা শুধু ছড়িয়েই পড়বে না বরং এই সঙ্গে আলোহীন হয়ে অন্ধকারও হয়ে যাবে। [সাদী]
- 3
وَإِذَا ٱلْجِبَالُ سُيِّرَتْ
Wa izal jibaalu suyyirat
আর পর্বতসমূহকে যখন চলমান করা হবে [১],
[১] পাহাড়সমূহকে কয়েকটি পর্যায়ে চলমান করা হবে। প্রথমে তা বিক্ষিপ্ত বালুরাশির মত হবে, তারপর তা ধূনিত পশমের মত হবে, সবশেষে তা উৎক্ষিপ্ত ধূলিকণা হয়ে যাবে এবং তার জায়গায় আর অবস্থিত থাকবে না। [সাদী]
- 4
وَإِذَا ٱلْعِشَارُ عُطِّلَتْ
Wa izal 'ishaaru 'uttilat
আর যখন পূর্ণগর্ভা মাদী উট উপেক্ষিত হবে [১] ,
[১] আরবদেরকে কিয়ামতের ভায়াবহ অবস্থা বুঝানোর জন্য এটি ছিল একটি চমৎকার বর্ণনা পদ্ধতি। কেননা কুরআনে আরবদেরই সম্বোধন করা হয়েছে। আরবদের কাছে গর্ভবর্তী মাদী উট, যার প্রসবের সময় অতি নিকটে, তার চেয়ে বেশী মূল্যবান আর কোনো সম্পাদই ছিল না। এ সময় তার হেফাজত ও দেখাশুনার জন্য সবচেয়ে বেশী যত্ন নেয়া হতো। এই ধরনের উষ্ট্রীদের থেকে লোকদের গাফেল হয়ে যাওয়ার মানে এই দাঁড়ায় যে, তখন নিশ্চয়ই এমন কোনো কঠিন বিপদ লোকদের ওপর এসে পড়বে যার ফলে তাদের নিজেদের এই সবচেয়ে প্রিয় সম্পদ সংরক্ষণের কথা তাদের খেয়ালই থাকবে না। [ইবন কাসীর, সাদী]
- 5
وَإِذَا ٱلْوُحُوشُ حُشِرَتْ
Wa izal wuhooshu hushirat
আর যখন বন্য পশুগুলো একত্র করা হবে,
- 6
وَإِذَا ٱلْبِحَارُ سُجِّرَتْ
Wa izal bihaaru sujjirat
আর যখন সাগরকে অগ্নি-উত্তাল করা হবে [১],
[১] এর কয়েকটি অর্থ রয়েছে। একটি অর্থ হল অগ্নিসংযোগ করা ও প্রজ্জ্বলিত করা। কেউ কেউ বলেন, সমুদ্রগুলোকে স্ফীত করা হবে। কেউ কেউ এর অর্থ নিয়েছেন, পানি পূর্ণ করা হবে। অন্য কেউ অর্থ নিয়েছেন মিশ্রিত করা অর্থাৎ সমস্ত সমুদ্র এক করে দেয়া হবে, ফলে লবনাক্ত ও সুমিষ্ট পানি একাকার হয়ে যাবে। হাসান ও কাতাদাহ রাহেমাহুমাল্লাহ বলেন, এর অর্থ তার পানিসমূহ নিঃশেষ হয়ে যাবে ফলে তাতে এক ফোটা পানিও থাকবে না। [কুরতুবী]
- 7
وَإِذَا ٱلنُّفُوسُ زُوِّجَتْ
Wa izan nufoosu zuwwijat
আর যখন আত্মাগুলোকে সমগোত্রীয়দের সাথে মিলিয়ে দেয়া হবে [১] ,
[১] এর অর্থ হচ্ছে, যখন মানুষকে জোড়া জোড়া করা হবে। অর্থাৎ মানুষের আমল অনুসারে তাদের শ্রেণীবিভাগ করা হবে। যখন হাশরে সমবেত লোকদেরকে বিভিন্ন দলে দলবদ্ধ করে দেয়া হবে। এই দলবদ্ধকরণ ঈমান ও কর্মের দিক দিয়ে করা হবে। কাফের এক জায়গায় ও মুমিন এক জায়গায়। কাফের এবং মুমিনের মধ্যেও কর্ম এবং অভ্যাসের পার্থক্য থাকে। এদিকে দিয়ে কাফেরদেরও বিভিন্ন প্রকার দল হবে আর মুমিনদেরও বিশ্বাস এবং কর্মের ভিত্তিতে দল হবে। যারা ভাল হোক মন্দ হোক একই প্রকার কর্ম করবে তাদেরকে এক জায়গায় জড়ো করা হবে। উদাহরণত ইহুদীরা ইহুদীদের সাথে, নাসারারা নাসারাদের সাথে, মুনাফিকরা মুনাফিকদের সাথে এক জায়গায় সমবেত হবে। মূলতঃ হাশরে লোকদের তিনটি প্রধান দল হবে- (১) পূর্ববর্তী সৎকর্মী লোকদের (২) আসহাবুল ইয়ামীনের এবং (৩) আসহাবুশ শিমালের দল। প্রথমোক্ত দুই দল মুক্তি পাবে এবং তৃতীয় দলটি হবে কাফের পাপাচারীদের। তারা মুক্তি পাবে না। [তাবারী, কুরতুবী] এ আয়াতের আরেকটি অর্থও হতে পারে। আর তা হল, ‘যখন আত্মাকে দেহের সাথে পুনঃমিলিত করা হবে’। কেয়ামতের সময়ে সকলকে জীবিত করার জন্য প্রথমে দেহকে পুনরায় সৃষ্টি করা হবে। অতঃপর আত্মাকে দেহের সাথে সংযোজন করা হবে। [কুরতুবী, ইবন কাসীর] এ আয়াত এবং এর পূর্ববর্তী আয়াত থেকে কিয়ামতের দ্বিতীয় অংশের আলোচনা শুরু হচ্ছে।
- 8
وَإِذَا ٱلْمَوْءُۥدَةُ سُئِلَتْ
Wa izal maw'oodatu su'ilat
আর যখন জীবন্ত সমাধিস্থ কন্যাকে [১] জিজ্ঞেস করা হবে,
[১] المَوْءُوْدَةُ শব্দের অর্থ জীবন্ত প্রোথিত কন্যা। জাহেলিয়াত যুগের কোনো কোনো আরব গোত্ৰ কন্যা সন্তানকে লজ্জাকর মনে করত এবং জীবন্তই মাটিতে প্রোথিত করে দিত। [ইবন কাসীর, কুরতুবী] পরবর্তীতে ইসলাম এই কুপ্রথার মূলোৎপাটন করে।
- 9
بِأَىِّ ذَنۢبٍۢ قُتِلَتْ
Bi ayyi zambin qutilat
কী অপরাধে তাকে হত্যা করা হয়েছিল [১]?
[১] কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, এই আয়াতের বর্ণনাভঙ্গীতে মারাত্মক ধরনের ক্রোধের প্রকাশ দেখা যায়। যে পিতা বা মাতা তাদের মেয়েকে জীবিত পুঁতে ফেলেছে আল্লাহর কাছে তারা এত বেশী ঘৃণিত হবে যে, তাদেরকে সম্বোধন করে একথা জিজ্ঞেস করা হবে না, তোমরা এই নিষ্পাপ শিশুটিকে হত্যা করেছিলে কোন অপরাধে? বরং তাদের দিক থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে নিয়ে ছোট্ট নিরপরাধ মেয়েকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমাকে কোন অপরাধে মেরে ফেলা হয়েছিল? [ইবন কাসীর]
- 10
وَإِذَا ٱلصُّحُفُ نُشِرَتْ
Wa izas suhufu nushirat
আর যখন আমলনামাগুলো উন্মোচিত করা হবে,
- 11
وَإِذَا ٱلسَّمَآءُ كُشِطَتْ
Wa izas samaaa'u kushitat
আর যখন আসমানের আবরণ অপসারিত করা হবে [১],
[১] كشطت এর আভিধানিক অর্থ জন্তুর চামড়া খসানো। [কুরতুবী] এর অর্থ অপসারণ করা, সরিয়ে নেয়া। এ হিসেবে আয়াতের অর্থ এই যে, যখন মাথার উপর ছাদের ন্যায় বিস্তৃত এই আকাশকে অপসারিত করা হবে। [মুয়াসসার, সাদী]
- 12
وَإِذَا ٱلْجَحِيمُ سُعِّرَتْ
Wa izal jaheemu su'-'irat
আর যখন জাহান্নামকে ভীষণভাবে প্ৰজ্জ্বলিত করা হবে,
- 13
وَإِذَا ٱلْجَنَّةُ أُزْلِفَتْ
Wa izal jannatu uzlifat
আর যখন জান্নাত নিকটবর্তী করা হবে,
- 14
عَلِمَتْ نَفْسٌۭ مَّآ أَحْضَرَتْ
'Alimat nafsum maaa ahdarat
তখন প্ৰত্যেক ব্যক্তিই জানবে সে কি উপস্থিত করেছে [১]।
[১] অর্থাৎ কেয়ামতের উপরোক্ত পরিস্থিতিতে প্রত্যেকই জেনে নিবে সে কি নিয়ে এসেছে। অর্থাৎ সৎকর্ম কিংবা অসৎকর্ম সব তার দৃষ্টির সামনে এসে যাবে। [মুয়াসসার]
- 15
فَلَآ أُقْسِمُ بِٱلْخُنَّسِ
Falaaa uqsimu bil khunnas
সুতরাং আমি শপথ করছি পশ্চাদপসরণকারী নক্ষত্রের,
- 16
ٱلْجَوَارِ ٱلْكُنَّسِ
Al jawaaril kunnas
যা চলমান, অপসৃয়মাণ,
- 17
وَٱلَّيْلِ إِذَا عَسْعَسَ
Wallaili izaa 'as'as
শপথ রাতের যখন তা শেষ হয় [১]
[১] عَسْعَسَ শব্দটির দু‘টি অর্থ হতে পারে। একটি উপরে আছে, তা হচ্ছে বিদায় নেয়া, শেষ হওয়া। অপর অর্থ হল আগমন করা, প্রবেশ করা। তখন আয়াতটির অর্থ হয়, শপথ রাতের, যখন তা আগমন করে। [ইবন কাসীর]
- 18
وَٱلصُّبْحِ إِذَا تَنَفَّسَ
Wassubhi izaa tanaffas
শপথ প্ৰভাতের যখন তার আবির্ভাব হয়,
- 19
إِنَّهُۥ لَقَوْلُ رَسُولٍۢ كَرِيمٍۢ
Innahoo laqawlu rasoolin kareem
নিশ্চয়ই এ কুরআন সম্মানিত রাসূলের আনীত বাণী [১]
[১] এখানে সম্মানিত বাণীবাহক رَسُوْلٍ كَرِيْمٍ বলতে অহী আনার কাজে লিপ্ত ফেরেশতা জিবরীল আলাইহিস্ সালামকে বোঝানো হয়েছে। পরবর্তী আয়াতে এ-কথাটি আরো সুস্পষ্ট করে বলা হয়েছে। নবী-রাসূলগণের মতো ফেরেশতাগণের বেলায়ও রাসূল শব্দ ব্যবহৃত হয়। উল্লেখিত সবগুলো বিশেষণ জিবরীল আলাইহিস্ সালাম এর জন্যে বিনা দ্বিধায় প্রযোজ্য। তিনি যে শক্তিশালী, তা অন্যত্রও বলা হয়েছে, عَلَّمَهٗ شَدِيْدُالْقُوٰى “তাঁকে শিক্ষা দান করে শক্তিশালী।” [সূরা আন-নাজম ৫] তিনি যে আরশ ও আকাশবাসী ফেরেশতাগণের মান্যবর তা মি'রাজের হাদীস দ্বারা প্ৰমাণিত আছে; তিনি রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে সাথে নিয়ে আকাশে পৌছলে তাঁর আদেশে ফেরেশতারা আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়। তিনি যে أمين তথা বিশ্বাসভাজন তা বর্ণনার অপেক্ষা রাখে না; আল্লাহ্ তা’আলা নিজেই তার আমানত বা বিশ্বস্ততার ঘোষণা দিয়েছেন, তাকে অহীর আমানত দিয়েছেন। [ইবন কাসীর, কুরতুবী] আর কুরআনকে “বাণীবাহকের বাণী” বলার অর্থ এই নয় যে, এটি ঐ সংশ্লিষ্ট ফেরেশতার নিজের কথা। বরং “বাণীবাহকের বাণী” শব্দ দু‘টিই একথা প্ৰকাশ করছে যে, এটি সেই সত্তার বাণী যিনি তাকে বাণীবাহক করে পাঠিয়েছেন। সূরা ‘আল-হাক্কা’র ৪০ আয়াতে এভাবে কুরআনকে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী বলা হয়েছে। সেখানেও এর অর্থ এই নয় যে, এটি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিজের রচনা। বরং একে “রাসূলে করীমের” বাণী বলে একথা সুস্পষ্ট করা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এটি পেশ করছেন, মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ হিসেবে নয়। উভয় স্থানে বাণীকে ফেরেশতা ও মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাথে সম্পর্কিত করার কারণ হচ্ছে এই যে, আল্লাহর বাণী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সামনে বাণীবহনকারী ফেরেশতার মুখ থেকে এবং লোকদের সামনে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের মুখ থেকে উচ্চারিত হচ্ছিল। [বাদায়িউত তাফসীর]
- 20
ذِى قُوَّةٍ عِندَ ذِى ٱلْعَرْشِ مَكِينٍۢ
Zee quwwatin 'inda zil 'arshi makeen
যে সামর্থ্যশালী, আরশের মালিকের কাছে মর্যাদা সম্পন্ন,
- 21
مُّطَاعٍۢ ثَمَّ أَمِينٍۢ
Mutaa'in samma ameen
সে মান্য সেখানে, বিশ্বাসভাজন [১]।
[১] অর্থাৎ এই কুরআন একজন সম্মানিত দূতের আনীত কালাম। তিনি শক্তিশালী, আরাশের অধিপতির কাছে মর্যাদাশীল। তিনি ফেরেশতাদের নিকট মান্য। সমস্ত ফেরেশতা তাকে মান্য করে। তিনি আল্লাহর বিশ্বাসভাজন; পয়গাম আনা নেয়ার কাজে তার তরফ থেকে বিশ্বাসভঙ্গ ও কম বেশী করার সম্ভাবনা নেই। নিজের পক্ষ থেকে তিনি কোনো কথা আল্লাহর অহীর সাথে মিশিয়ে দেবেন না। বরং তিনি এমন পর্যায়ের আমানতদার যে, আল্লাহর পক্ষ থেকে যা কিছু বলা হয় সেগুলো তিনি হুবহু পৌছিয়ে দেন। [মুয়াসসার, সাদী]
- 22
وَمَا صَاحِبُكُم بِمَجْنُونٍۢ
Wa maa saahibukum bimajnoon
আর তোমাদের সাথী উন্মাদ নন [১],
[১] এখানে সাথী বলতে মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বুঝানো হয়েছে। যারা রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে উম্মাদ বলত এতে তাদেরকে জওয়াব দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ তোমাদের এ ধারণা ঠিক নয় যে, কুরআনে যা কিছু বর্ণনা করা হচ্ছে এগুলো কোনো পাগলের প্রলাপ বা শয়তানের বক্তব্য। [কুরতুবী]
- 23
وَلَقَدْ رَءَاهُ بِٱلْأُفُقِ ٱلْمُبِينِ
Wa laqad ra aahu bilufuqil mubeen
তিনি তো তাকে স্পষ্ট দিগন্তে দেখেছেন [১],
[১] অর্থাৎ মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জিবরীল আলাইহিস্ সালামকে প্রকাশ্য দিগন্তে, মূল আকৃতিতে দেখেছেন। অন্যত্র বলা হয়েছে, فَاسْتَوٰى ٭ وَهُوَبِالْاُفْقِ الْاَعْلٰى “সে নিজ আকৃতিতে স্থির হয়েছিল, তখন সে উর্ধ্বদিগন্তে।” [সূরা আন-নাজম ৬-৭] [ইবন কাসীর] এই দেখার কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, তিনি ওহী নিয়ে আগমনকারী জিবরীল আলাইহিস্ সালামের সাথে পরিচিত ছিলেন। তাকে আসল আকার আকৃতিতেও দেখেছিলেন। তাই এই ওহীতে কোনোরূপ সন্দেহ সংশয়ের অবকাশ নেই।
- 24
وَمَا هُوَ عَلَى ٱلْغَيْبِ بِضَنِينٍۢ
Wa maa huwa 'alal ghaibi bidaneen
তিনি গায়েবী বিষয় সম্পর্কে কৃপণ নয় [১]।
[১] অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ্ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তোমাদের কাছ থেকে কোনো কথা গোপন রাখেন না। গায়েব থেকে তার কাছে যেসব তথ্য বা অহী আসে তা সবই তিনি একটুও কমবেশী না করে তোমাদের কাছে বর্ণনা করেন। [সা‘দী]
- 25
وَمَا هُوَ بِقَوْلِ شَيْطَٰنٍۢ رَّجِيمٍۢ
Wa maa huwa biqawli shaitaanir rajeem
আর এটা কোনো অভিশপ্ত শয়তানের বাক্য নয়।
- 26
فَأَيْنَ تَذْهَبُونَ
Fa ayna tazhaboon
কাজেই তোমরা কোথায় যাচ্ছ?!
- 27
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌۭ لِّلْعَٰلَمِينَ
In huwa illaa zikrul lil'aalameen
এ তো শুধু সৃষ্টিকুলের জন্য উপদেশ,
- 28
لِمَن شَآءَ مِنكُمْ أَن يَسْتَقِيمَ
Liman shaaa'a minkum ai yastaqeem
তোমাদের মধ্যে যে সরল পথে চলতে চায়, তার জন্য [১]।
[১] অন্য কথায় বলা যায়, এ বাণীটি তো সারা দুনিয়ার মানুষের জন্য উপদেশ একথা ঠিক, কিন্তু এর থেকে ফায়দা একমাত্র সেই ব্যক্তি হাসিল করতে পারে যে নিজে সত্য-সরল পথে চলতে চায়। এ উপদেশ থেকে উপকৃত হওয়ার জন্য মানুষের সত্য-সন্ধানী ও সত্য প্রিয় হওয়া প্ৰথম শর্ত। [বাদায়িউত তাফসীর]
- 29
وَمَا تَشَآءُونَ إِلَّآ أَن يَشَآءَ ٱللَّهُ رَبُّ ٱلْعَٰلَمِينَ
Wa maa tashaaa'oona illaaa ai yashaaa 'al laahu Rabbul 'Aalameen
আর তোমরা ইচ্ছে করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ্ ইচ্ছে করেন [১]।
[১] অর্থাৎ তোমরা সরল পথে চলতে চাইলে এবং আল্লাহর দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে চাইলেই থাকতে পারবে না যতক্ষণ আল্লাহ্ ইচ্ছা না করবেন। সুতরাং তাঁর কাছেই তাওফীক কামনা করো। তবে এটা সত্য যে, কেউ যদি আল্লাহর পথে চলতে ইচ্ছে করে তবে আল্লাহ্ও তাকে সেদিকে চলতে সহযোগিতা করেন। মূলতঃ আল্লাহর ইচ্ছা হওয়ার পরই বান্দার সে পথে চলার তাওফীক হয়। বান্দার ইচ্ছা আল্লাহ্র ইচ্ছা অনুসারেই হয়। তবে যদি ভাল কাজ হয় তাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি থাকে, এটাকে বলা হয় ‘আল্লাহর শরীয়তগত ইচ্ছা’। পক্ষান্তরে খারাপ কাজ হলে আল্লাহর ইচ্ছায় সংঘটিত হলেও তাতে তাঁর সন্তুষ্টি থাকে না। এটাকে বলা হয় ‘আল্লাহর প্রাকৃতিক ইচ্ছা’। এ দু' ধরনের ইচ্ছার মধ্যে পার্থক্য না করার কারণে অতীতে ও বর্তমানে অনেক দল ও ফের্কার উদ্ভব ঘটেছে। [দেখুন, ইবন তাইমিয়্যাহ, আল-ইস্তেকামাহ ১/৪৩৩; মিনহাজুস সুন্নাহ ৩/১৬৪]
অনুবাদ: ড. আবু বকর মুহাম্মাদ যাকারিয়া · QuranEnc.com
